সকালে ঘুম থেকে উঠতে না পারা বা রাত জাগার অভ্যাস বর্তমান যুগের একটি সাধারণ সমস্যা, যা শরীরের স্বাভাবিক জৈবঘড়িকে ব্যাহত করছে। বহু মানুষ রাতের প্যাঁচা থেকে সকালের পাখিতে পরিণত হওয়ার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়, কারণ শরীরের অভ্যাসগুলো সহজেই বদলাতে পারে না। এই অবস্থা দীর্ঘমেয়াদে মানসিক চাপ, শারীরিক দুর্বলতা এবং কর্মদক্ষতা হ্রাসের মতো গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে। তাই শরীরের প্রাকৃতিক ঘুম-জাগ্রত চক্র বা সারকাদিয়ান রিদমকে পুনরুদ্ধার করা এখন অত্যন্ত জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
শরীরের জৈবঘড়ি মূলত মস্তিষ্কের হাইপোথ্যালামাস অঞ্চলে অবস্থিত একটি ছোট্ট অংশ, যা আলো, তাপমাত্রা এবং খাদ্যাভ্যাসের ওপর ভিত্তি করে ঘুম ও জাগরণ নিয়ন্ত্রণ করে। যখন আমরা দীর্ঘদিন ধরে নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমাতে বা জাগতে ব্যর্থ হই, তখন এই জৈবঘড়ি সরে যায় এবং শরীরের হরমোন নিঃসরণ, হজম প্রক্রিয়া এবং শক্তি সঞ্চয়ন প্রক্রিয়া বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। রাতের অতিরিক্ত আলো, বিশেষত ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি থেকে আসা নীল আলো, ঘুমের হরমোন মেলোটোনিনের নিঃসরণে বাধা দেয়, ফলে ঘুমের গভীরতা কমে যায় এবং সকালে উঠতে কষ্ট হয়।
সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, জৈবঘড়ি ঠিক রাখতে প্রথমে ঘুমের সময়কাল ধারাবাহিক রাখতে হবে, অর্থাৎ প্রতিদিন একই সময়ে ঘুমাতে যাবেন এবং একই সময়ে উঠবেন, এমনকি ছুটির দিনেও। সন্ধ্যার পরে ক্যাফেইনযুক্ত পানীয়, ভারী খাবার এবং ইলেকট্রনিক ডিভাইস ব্যবহার থেকে বিরত থাকা উচিত। বিছানায় শুয়ে থাকার আগে শরীরকে শিথিল করতে হালকা যোগব্যায়াম বা গভীর শ্বাসপ্রশ্বাসের অনুশীলন করা যেতে পারে। এছাড়া, ঘুমের ঘরকে ঠান্ডা, অন্ধকার এবং নিঃশব্দ রাখা ঘুমের মান উন্নত করতে সাহায্য করে। এই অভ্যাসগুলো ধারাবাহিকভাবে অনুসরণ করলে শরীরের জৈবঘড়ি ক্রমশ ঠিক পথে ফিরে আসে এবং সকালে তাজা হয়ে ওঠার অনুভূতি ফিরে আসে।
কর্তৃপক্ষ ও স্বাস্থ্য বিভাগের পক্ষ থেকে জনসাধারণকে সচেতন করার জন্য বিভিন্ন প্রচারণা চালানো হচ্ছে। ভবিষ্যতে কর্মক্ষেত্রে এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে স্বাস্থ্যসম্মত জীবনযাপনের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে বলে আশা করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দিয়েছেন, যদি এই পদ্ধতিগুলো অনুসরণ করেও ঘুমের সমস্যা দূর না হয়, তবে একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। শরীরের জৈবঘড়ি ঠিক রাখা কেবল ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যের জন্যই নয়, সামগ্রিক সামাজিক ও অর্থনৈতিক উৎপাদনশীলতার জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই আজ থেকেই সঠিক ঘুমের অভ্যাস গড়ে তুলে সুস্থ ও সক্রিয় জীবনযাপনের লক্ষ্যে এগিয়ে যেতে হবে।