প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০২৪ সালের জুন মাসে জাপান সফর করেন, যেখানে জাপানের প্রধানমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রীসহ উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমে দুই দেশের কূটনৈতিক বন্ধনকে নতুন মাত্রা প্রদান করা হয়। সফরের মূল লক্ষ্য ছিল জাপান থেকে সরাসরি বিদেশি সরাসরি বিনিয়োগ (এফডিআই) আকৃষ্ট করা, বিশেষত উৎপাদন, জ্বালানি, পানি সরবরাহ ও পরিবহন সংযোগের ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট প্রকল্প উপস্থাপন করা। সফরের তাৎক্ষণিক গুরুত্বের মধ্যে রয়েছে জাপানের উন্নত প্রযুক্তি ও আর্থিক সহায়তা ব্যবহার করে বাংলাদেশের অবকাঠামো ঘাটতি পূরণ, পাশাপাশি রপ্তানি‑বাজারের বৈচিত্র্যকরণ। এই সফরকে দেশের অর্থনৈতিক নীতি নির্ধারণে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ‑জাপান সম্পর্কের পটভূমি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ১৯৭২ সালে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের পর থেকে দুই দেশ বহু ক্ষেত্রেই পারস্পরিক সহযোগিতা চালিয়ে আসছে। জাপান ইতিমধ্যে বাংলাদেশে রেলওয়ে, সড়ক, বন্দর ও বিদ্যুৎ প্রকল্পে উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ করেছে; তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিনিয়োগের হার স্থবিরতা দেখিয়েছে। দেশের দ্রুত নগরায়ন, শিল্পায়ন ও জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুৎ ঘাটতি, পানি সংকট ও পরিবহন জ্যাম বৃদ্ধি পেতে থাকে, যা সমাধানের জন্য জাপানের উন্নত প্রযুক্তি ও আর্থিক সম্পদ অপরিহার্য। তাই, প্রস্তুত জমি, বিদ্যুৎ সংযোগ, পানি সরবরাহ ব্যবস্থা ও অনুমোদন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, জাপানি বিনিয়োগকারীদের জন্য আকর্ষণীয় শর্ত তৈরি করতে সহায়ক হবে।
সফরের সময়ে জাপানের অর্থমন্ত্রী শিনোইচি হোশি উল্লেখ করেন, বাংলাদেশে বিনিয়োগের জন্য জাপান “দীর্ঘমেয়াদী কৌশলগত অংশীদার” হতে ইচ্ছুক এবং প্রস্তুত জমি ও অনুমোদন প্রক্রিয়া দ্রুততর করার জন্য দু’পক্ষের সমন্বয় প্রয়োজন। বাংলাদেশ ব্যাংকের গবর্নর মোহাম্মদ জাফর ইকবালও জাপান থেকে সরবরাহিত সবুজ শক্তি প্রকল্পের সম্ভাবনা তুলে ধরেন, যা দেশের জ্বালানি মিশ্রণকে পরিষ্কার ও টেকসই করতে সহায়তা করবে। দেশের শিল্প সমিতি ও ব্যবসা গোষ্ঠী সফরের পর জাপানি প্রযুক্তি ও পুঁজি প্রবাহে আশাবাদ প্রকাশ করে, তবে তারা জোর দেন যে প্রকল্পের বাস্তবায়নে স্থানীয় দক্ষতা ও শ্রমের ব্যবহার নিশ্চিত করা উচিত। সাধারণ জনগণের মধ্যেও জাপান সফরকে ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখা হচ্ছে; বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায় বিদ্যুৎ ও পানির উন্নত সেবা প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
সফরের পরপরই সরকার জাপানি বিনিয়োগের জন্য একক জানালা (সিঙ্গল উইন্ডো) ব্যবস্থা চালু করেছে, যাতে অনুমোদন প্রক্রিয়া দ্রুত ও স্বচ্ছ হয়। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলো ইতিমধ্যে প্রস্তুত জমি চিহ্নিত করে, পরিবহন সংযোগের জন্য রেলওয়ে ও সড়ক নেটওয়ার্কের পরিকল্পনা চূড়ান্ত করেছে। এছাড়া, জাপান‑বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সহযোগিতা ফোরাম (এবিসিএফ) আয়োজনের মাধ্যমে দুই দেশের বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে প্রযুক্তি স্থানান্তর, মানবসম্পদ উন্নয়ন ও গবেষণা সহযোগিতার বিস্তারিত পরিকল্পনা তৈরি করা হবে। ভবিষ্যতে, জাপান থেকে আসা বিনিয়োগের মাধ্যমে দেশের জ্বালানি ঘাটতি কমে, শিল্প উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে এবং রপ্তানি পণ্যের গুণগত মান উন্নত হবে বলে সরকারী অনুমান। এই পদক্ষেপগুলোকে দেশের দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক স্বাবলম্বন ও টেকসই উন্নয়নের ভিত্তি হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে।