গত সপ্তাহে ঢাকা শহরের ঐতিহাসিক গির্জা কমপ্লেক্সে জাতীয় চার্চ পরিষদের ৭৫তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী উদ্যাপন অনুষ্ঠিত হয়। দেশি-বিদেশি বিশিষ্ট অতিথি, বিভিন্ন ধর্মের নেতৃবৃন্দ এবং খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিরা একত্রিত হয়ে এই ঐতিহ্যবাহী অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেন। উদ্যাপনটি দুই দিনব্যাপী সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানের মাধ্যমে পরিচালিত হয়, যেখানে গীত, নৃত্য, ধর্মীয় উপদেশ এবং ঐতিহাসিক চিত্রপ্রদর্শনী অন্তর্ভুক্ত ছিল। এই অনুষ্ঠানটি দেশের ধর্মীয় সহনশীলতা ও আন্তঃধর্মীয় সংহতির প্রতীক হিসেবে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।
জাতীয় চার্চ পরিষদ ১৯৪৯ সালে স্বাধীনতার পূর্বে গঠিত হয়, যখন দেশীয় খ্রিষ্টান সম্প্রদায় স্বতন্ত্র ধর্মীয় সংগঠন গঠন ও সামাজিক উন্নয়নের লক্ষ্যে একত্রিত হয়েছিল। প্রতিষ্ঠার পর থেকে পরিষদটি শিক্ষা, স্বাস্থ্য, দারিদ্র্য বিমোচন এবং মানবাধিকার সংরক্ষণে বহু প্রকল্প চালু করেছে। গির্জা নির্মাণ, বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা, গ্রামীণ চিকিৎসা শিবির এবং নারী ক্ষমতায়নের কর্মসূচি এর প্রধান সাফল্য হিসেবে স্বীকৃত। অতীতের রাজনৈতিক অশান্তি ও ধর্মীয় উত্তেজনা সত্ত্বেও পরিষদটি ধারাবাহিকভাবে আন্তঃধর্মীয় সংলাপ ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের মঞ্চ তৈরি করেছে, যা দেশের সামগ্রিক সামাজিক স্থিতিশীলতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
উদ্যাপনে উপস্থিত রোমান ক্যাথলিক আর্কবিশপ সিলভিও রোড্রিগেজ বলেন, ‘৭৫ বছর ধরে পরিষদটি ধর্মীয় ঐক্য ও সামাজিক দায়িত্বের মডেল হিসেবে কাজ করেছে, এবং ভবিষ্যতেও এই দৃষ্টিভঙ্গি বজায় থাকবে।’ এছাড়া বাংলাদেশের প্রধান ধর্মীয় নেতা হযরত মুআউদুল হক, যিনি ধর্মীয় সংহতি ও শান্তির পক্ষে সমর্থন প্রকাশ করেছেন, তিনি উল্লেখ করেন, ‘এই ধরনের অনুষ্ঠান আমাদের বহুমুখী সমাজের ঐক্যবদ্ধ চিত্র তুলে ধরে এবং সকল ধর্মের মানুষের মধ্যে পারস্পরিক সম্মান গড়ে তুলতে সহায়তা করে।’ একটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার কর্মীও উপস্থিত ছিলেন, যিনি বাংলাদেশের ধর্মীয় সহনশীলতা প্রশংসা করে বলেন, ‘এখানে দেখা যায় কীভাবে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান সমাজের উন্নয়নে সক্রিয় ভূমিকা নিতে পারে।’ এইসব মন্তব্য দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পরিষদের কাজের স্বীকৃতি ও প্রশংসা বাড়িয়ে তুলেছে।
সরকার এই উদ্যাপনকে জাতীয় ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে, ভবিষ্যতে ধর্মীয় সংহতি ও সামাজিক উন্নয়নের জন্য বিশেষ নীতি প্রণয়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। সংস্কৃতি ও ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয় পরিষদের সঙ্গে সমন্বয় করে একটি দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা তৈরি করেছে, যার মধ্যে ধর্মীয় শিক্ষার আধুনিকীকরণ, গ্রামীণ এলাকায় স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ এবং যুবকদের জন্য নেতৃত্ব প্রশিক্ষণ কর্মসূচি অন্তর্ভুক্ত থাকবে। এছাড়া, জাতীয় চার্চ পরিষদকে সরকারী তহবিলের মাধ্যমে তার সামাজিক প্রকল্পগুলোকে আরও বিস্তৃত করার অনুমতি প্রদান করা হয়েছে। এই পদক্ষেপগুলো দেশের ধর্মীয় বহুমুখিতা বজায় রেখে সমন্বিত উন্নয়নের পথ সুগম করবে বলে বিশ্লেষকরা আশা প্রকাশ করছেন।