গত সপ্তাহে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্বে এক গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ উপস্থাপন করেন। ভাষণে তিনি রোহিঙ্গা শরণার্থীদের নিরাপদে মিয়ানমারে স্বেচ্ছাসেবীভাবে ফিরে যাওয়ার জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃঢ় ও কার্যকর সমর্থন দাবি করেন। এছাড়া তিনি প্রযুক্তিবৈষম্য দূরীকরণ, ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তি এবং শরণার্থীদের জন্য ন্যায্য তথ্যপ্রযুক্তি সুবিধা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। প্রধানমন্ত্রী জোর দিয়ে বলেন, রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান কেবল মানবিক সহায়তায় সীমাবদ্ধ নয়, বরং আধুনিক প্রযুক্তির সমান সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করাও সমাধানের একটি অপরিহার্য অংশ। এই আহ্বান আন্তর্জাতিক সংস্থা, প্রতিবেশী দেশ এবং বেসরকারি সংস্থাগুলোর সমন্বিত পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে। তিনি উল্লেখ করেন, রোহিঙ্গা জনগণের মৌলিক মানবাধিকার রক্ষা না হলে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও মানবিক নীতির প্রতি আস্থা ক্ষয়প্রাপ্ত হবে।
রোহিঙ্গা সংকটের শিকড় ২০১২ সালের গৃহযুদ্ধ থেকে শুরু হলেও ২০১৭ সালের ভয়াবহ সামরিক অভিযান থেকে আন্তর্জাতিক দৃষ্টিতে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়। সেই সময়ে লক্ষ লক্ষ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়, যা দেশের সর্ববৃহৎ শরণার্থী সংকটের রূপ নেয়। শরণার্থীদের মৌলিক চাহিদা মেটাতে মানবিক সহায়তা, স্বাস্থ্যসেবা এবং শিক্ষা প্রদান করা হয়েছে, তবু নিরাপদ পুনর্বাসনের পথ এখনও অনিশ্চিত। একই সঙ্গে, শরণার্থীদের ডিজিটাল প্রবেশাধিকার সীমিত হওয়ায় তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারে বৈষম্য দেখা যায়; ইন্টারনেট সংযোগ, মোবাইল সেবা এবং অনলাইন শিক্ষা প্ল্যাটফর্মে প্রবেশের সুযোগ কমে যায়, যা তাদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক পুনরায় সংহতিতে বাধা সৃষ্টি করে।
জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্টনি গুটেরেস এই বিষয়কে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ও মানবাধিকার সংরক্ষণের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, রোহিঙ্গা শরণার্থীদের স্বেচ্ছাসেবী প্রত্যাবর্তন নিশ্চিত করতে সকল পক্ষের সমন্বিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন। মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালও রোহিঙ্গা জনগণের মৌলিক অধিকার রক্ষার জন্য ত্বরিত পদক্ষেপের আহ্বান জানায় এবং প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রদান করে তাদের ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তি বাড়ানোর প্রস্তাব রাখে। দেশের প্রধান বিরোধী দলও প্রধানমন্ত্রীকে প্রশংসা করে রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধানে আন্তর্জাতিক সমর্থনের গুরুত্ব তুলে ধরেছে। শরণার্থী সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিরা নিরাপদ প্রত্যাবর্তনের পাশাপাশি শিক্ষা ও কর্মসংস্থান সুযোগের দাবিতে তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করেছে, যা দেশের সামাজিক সংহতিতে প্রভাব ফেলবে।
বাংলাদেশ সরকার ইতিমধ্যে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের নিরাপদ প্রত্যাবর্তনের জন্য মিয়ানমার সরকারের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক আলোচনার সূচনা করেছে এবং জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিনিধি দলের সঙ্গে সমন্বয় বাড়িয়ে তুলেছে। সরকার ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তি পরিকল্পনা চালু করে শরণার্থীদের জন্য সাশ্রয়ী ইন্টারনেট প্যাকেজ, মোবাইল সেবা এবং অনলাইন শিক্ষা সুবিধা প্রদান করবে বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। পাশাপাশি, আন্তর্জাতিক তহবিল সংগ্রহের মাধ্যমে শরণার্থীদের পুনর্বাসন, স্বাস্থ্য ও মানসিক সহায়তা নিশ্চিত করার জন্য বিশেষ তহবিল গঠন করা হবে। ভবিষ্যতে রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধানকে টেকসই ও মানবিক ভিত্তিতে গড়ে তোলার জন্য জাতিসংঘের রোডম্যাপ অনুসরণ করে বহুপাক্ষিক সহযোগিতা ও আইনি কাঠামো শক্তিশালী করা হবে।