বাংলাদেশের জাতীয় বাজেটে নারী উন্নয়ন ও সমতা নিশ্চিতকরণে বিশেষ বরাদ্দ রাখা হলেও এর প্রকৃত বাস্তবায়নে গুরুতর ঘাটতি রয়েছে বলে বিশ্লেষকদের মতামত। সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন সচিবালয় ও বিভাগীয় অফিসে পরিচালিত জেন্ডার সংবেদনশীল প্রকল্পগুলোর অগ্রগতি পর্যালোচনায় দেখা গেছে, বরাদ্দকৃত অর্থের একটি বড় অংশই অব্যবহৃত থেকে যাচ্ছে। এই অবস্থায় নারী শ্রমিক, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা এবং গ্রামীণ নারীদের জন্য নির্ধারিত বিশেষ সুবিধাগুলো পৌঁছানোর ক্ষেত্রে গতিমন্দার সৃষ্টি হয়েছে। সরকারের উদ্দেশ্য ছিল বাজেটের মাধ্যমে নারী অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন এবং সামাজিক নিরাপত্তা জোরদার করা, কিন্তু বাস্তবে এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে উল্লেখযোগ্য বাধা রয়েছে।
এই ঘাটতির পেছনে প্রধান কারণ হিসেবে উঠে এসেছে প্রশাসনিক জটিলতা এবং জেন্ডার বিষয়ক প্রকল্পগুলোর সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা না থাকা। অনেক ক্ষেত্রে বরাদ্দকৃত অর্থ সাধারণ উন্নয়ন খাতে মিশিয়ে ফেলা হয়, ফলে নারীদের জন্য নির্দিষ্ট কোনো উদ্দেশ্যমূলক প্রভাব সৃষ্টি হয় না। আবার কিছু ক্ষেত্রে প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের মধ্যে জেন্ডার সমতার বিষয়ে পর্যাপ্ত সচেতনতা না থাকার কারণে কার্যক্রম ধীরগতিতে এগোয়। এছাড়াও, নারীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিতকরণে স্থানীয় প্রশাসনের ভূমিকা সীমিত থাকায় প্রকল্পগুলোর সুফল প্রত্যক্ষভাবে নারীদের কাছে পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়।
সংশ্লিষ্ট নারী অধিকার কর্মী এবং অর্থনীতিবিদরা এই পরিস্থিতির তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। তাঁরা মনে করেন, জেন্ডার বাজেট কেবল একটি সংখ্যা নয়, বরং এটি একটি প্রতিশ্রুতি যা নারীদের জীবনমান উন্নয়নে সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে। বর্তমান পরিস্থিতিতে নারীরা যারা ক্ষুদ্র উদ্যোগে নিয়োজিত, তারা ঋণ সুবিধা এবং প্রশিক্ষণের মতো মৌলিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। জনজীবনে এর প্রভাব হিসেবে নারীদের আয়বৃদ্ধি এবং পরিবারের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা হুমকির মুখে পড়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যদি এই ঘাটতি দূর না করা হয়, তবে জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনায় নারীদের ভূমিকা সীমিত থেকেই যাবে এবং সামাজিক অসমতা আরও গভীর হবে।
কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে জানা গেছে, তারা এই সমস্যাটি গুরুত্বের সাথে দেখছে এবং শীঘ্রই জেন্ডার বাজেট বাস্তবায়ন কার্যক্রম ত্বরান্বিত করার জন্য বিশেষ কমিটি গঠন করা হবে। এই কমিটি প্রকল্পগুলোর অগ্রগতি মনিটরিং করবে এবং বাস্তবায়নে বাধাগুলো দূর করার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে। ভবিষ্যতে বাজেট প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় নারী সংগঠনগুলোর মতামত গ্রহণ এবং জেন্ডার সংবেদনশীল প্রকল্পগুলোর সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হবে বলে আশা করা হচ্ছে। বিশ্লেষকদের পরামর্শ অনুযায়ী, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা বৃদ্ধি এবং নারীদের সরাসরি অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা জরুরি, যাতে জেন্ডার বাজেটের প্রকৃত সুফল দেশের প্রতিটি নারীর কাছে পৌঁছাতে পারে এবং সামগ্রিক উন্নয়নে অবদান রাখতে পারে।