বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের চট্টগ্রাম বিভাগের রাঙ্গুনিয়া গ্রামে গত সপ্তাহে 'প্রকৃতি ও পরম্পরার সেতুবন্ধ' শীর্ষক একটি বৃহৎ পরিবেশ‑সাংস্কৃতিক মেলা উদ্বোধন করা হয়। মেলাটির মূল লক্ষ্য ছিল ঐতিহ্যবাহী কৃষি পদ্ধতি, হস্তশিল্প ও স্থানীয় জৈবিক জ্ঞানকে আধুনিক পরিবেশ সংরক্ষণ কৌশলের সঙ্গে সমন্বয় করা এবং জনগণের মধ্যে পরিবেশ সচেতনতা বৃদ্ধি করা। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের প্রধান অতিথি উপস্থিত ছিলেন, যাঁরা মেলাটির জাতীয় পর্যায়ে গুরুত্ব ও দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব তুলে ধরেছেন। মেলাটি একদিনে একশতাধিক কর্মশালা, প্রদর্শনী ও আলোচনা সেশনের মাধ্যমে দেশব্যাপী দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।
এই উদ্যোগের পেছনে রয়েছে গত দশকে বাংলাদেশের জলাভূমি হ্রাস, মাটি ক্ষয় ও ঐতিহ্যবাহী চাষাবাদের অবনতি। বিশেষত রাঙ্গুনিয়া অঞ্চলে প্রথাগত বৌদ্ধিক সম্পদ ও বন্যপ্রাণীর বাসস্থান দ্রুত হ্রাস পাচ্ছিল, যা স্থানীয় জীবিকায় প্রভাব ফেলছিল। সরকার পূর্বে 'গ্রামীন পরিবেশ সংরক্ষণ পরিকল্পনা' চালু করলেও বাস্তবায়নে সীমাবদ্ধতা দেখা গিয়েছিল। তাই পরিবেশ মন্ত্রণালয় ও কৃষি বিভাগ একত্রে ঐতিহ্যবাহী জ্ঞানকে আধুনিক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির সঙ্গে যুক্ত করে একটি সমন্বিত মডেল তৈরি করার সিদ্ধান্ত নেয়। মেলাটির মাধ্যমে ঐতিহাসিক পদ্ধতি পুনরুজ্জীবিত করে টেকসই উন্নয়নের পথ প্রশস্ত করা হবে।
মেলায় অংশগ্রহণকারী স্থানীয় কৃষক রমেশ চৌধুরী জানান, 'আমাদের পুরনো সেচ পদ্ধতি ও বীজ সংরক্ষণ পদ্ধতি পুনরায় ব্যবহার করলে উৎপাদন বাড়বে এবং পরিবেশের ক্ষতি কমবে'। একই সঙ্গে হস্তশিল্পী শারমিনা বেগম বলেন, 'প্রাকৃতিক রঙ ও বুনন কৌশলকে আধুনিক বাজারের সঙ্গে যুক্ত করলে গ্রামীণ আয় বৃদ্ধি পাবে'। পরিবেশবিদ ড. সুমন দাস উল্লেখ করেন, 'বৈজ্ঞানিক গবেষণার সঙ্গে ঐতিহ্যবাহী জ্ঞান মিলে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলায় কার্যকর সমাধান তৈরি করা সম্ভব'। মেলায় উপস্থিত সাধারণ জনগণও কর্মশালার মাধ্যমে টেকসই চাষাবাদ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে সচেতনতা অর্জন করেছে।
কর্তৃপক্ষ মেলাটির পরবর্তী ধাপে রাঙ্গুনিয়া গ্রামকে একটি পরিবেশ‑সাংস্কৃতিক মডেল জোন হিসেবে ঘোষণা করার পরিকল্পনা করেছে। পরিবেশ মন্ত্রণালয় আগামী ত্রৈমাসিকে একই রকম মেলা জাতীয় পর্যায়ে চালু করার পাশাপাশি স্থানীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলিতে পরিবেশ শিক্ষা পাঠ্যক্রম সংযোজনের নির্দেশ দিয়েছে। কৃষি বিভাগও প্রথাগত বীজ সংরক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন করে কৃষকদের জন্য বিনামূল্যে প্রশিক্ষণ প্রদান করবে। দীর্ঘমেয়াদে এই উদ্যোগটি দেশের পরিবেশ নীতি ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সংহতি নিশ্চিত করে টেকসই উন্নয়নের মডেল হিসেবে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রশংসা অর্জন করবে বলে আশা করা হচ্ছে।