আধুনিক টুথপেস্টের আগমনের পূর্বে মানুষ দাঁত পরিষ্কারের জন্য নানা প্রাকৃতিক ও প্রাচীন উপকরণ ব্যবহার করত। প্রাচীন মিশর, গ্রীস, রোম এবং ভারতীয় উপমহাদেশে লবণ, চুনের গুঁড়া, কাঠের কাঠি, তামার পাতা, তেল, মধু ও দই ইত্যাদি ঘর্ষণকারী ও পরিষ্কারকারী পদার্থ হিসেবে ব্যবহার করা হতো। এসব উপকরণ ঘষে দাঁতের পৃষ্ঠে জমে থাকা খাবারের অবশিষ্টাংশ ও প্লাক দূর করা হতো, ফলে মুখের স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটত। যদিও এই পদ্ধতিগুলো আধুনিক টুথপেস্টের তুলনায় কম কার্যকরী ছিল, তবু সেসব সময়ের মানুষের জন্য এগুলোই একমাত্র উপলব্ধ বিকল্প ছিল।
ইতিহাসবিদদের মতে, প্রাচীন মিশরে হাইরোগ্লিফিক্সে দাঁত পরিষ্কারের দৃশ্য দেখা যায়, যেখানে লবণ ও চুনের মিশ্রণ ব্যবহার করা হতো। গ্রীসে, গ্রীক দার্শনিক অ্যারিস্টটল উল্লেখ করেছেন যে, তিনি ওজন কমাতে এবং মুখের গন্ধ দূর করতে তেল ও মধু মিশ্রণ ব্যবহার করতেন। ভারতীয় ঐতিহ্যে, আয়ুর্বেদে ‘দাঁত পরিষ্কারের জন্য তিলের গুঁড়া ও তিলের তেল’ ব্যবহার করার পরামর্শ দেওয়া আছে। চীনে, চা পাতার ধুলো ও বেকিং সোডা মিশ্রণকে দাঁত পরিষ্কারের জন্য ব্যবহার করা হতো। এইসব পদ্ধতি প্রাকৃতিক উপাদানের ঘর্ষণশক্তি ও অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল গুণের ওপর নির্ভরশীল ছিল।
দাঁত পরিষ্কারের ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতি সম্পর্কে আধুনিক দন্তচিকিৎসক ও সংস্কৃতি গবেষকরা একমত যে, এসব প্রাচীন পদ্ধতি আজকের স্বাস্থ্যবিধি মানদণ্ডে যথাযথ নয়, তবে সেগুলো ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে গুরুত্বপূর্ণ। ড. রাহিমুল হক, একজন দন্তচিকিৎসক বলেন, “প্রাচীনকালে ব্যবহৃত লবণ ও চুনের গুঁড়া কিছুটা অম্লীয়তা সৃষ্টি করলেও, তা অতিরিক্ত ব্যবহার করলে এনামেল ক্ষয় করতে পারে।” অন্যদিকে, সমাজবিজ্ঞানী শ্রীমতী সুমিতা চৌধুরী উল্লেখ করেন, “এই প্রথাগুলো সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অংশ ছিল; গ্রামাঞ্চলে এখনও কিছু লোক তিলের তেল ও লবণ ব্যবহার করে দাঁত পরিষ্কার করেন, যা ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা রক্ষা করে।”
আজকের দিনে সরকার ও স্বাস্থ্য সংস্থা ঐতিহ্যবাহী দাঁত পরিষ্কারের পদ্ধতি সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং আধুনিক দন্তস্বাস্থ্যের গুরুত্ব প্রচার করছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সম্প্রতি স্কুলে দন্তস্বাস্থ্য শিক্ষা কর্মসূচি চালু করেছে, যেখানে শিশুরা সঠিক ব্রাশিং পদ্ধতি ও টুথপেস্টের সঠিক ব্যবহার শিখে। পাশাপাশি, ঐতিহাসিক গবেষণা কেন্দ্রগুলো প্রাচীন দাঁত পরিষ্কারের উপকরণ সংরক্ষণ ও বিশ্লেষণ করে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য তথ্যভাণ্ডার গঠন করছে। এভাবে, অতীতের বিচিত্র পদ্ধতি ও আধুনিক বিজ্ঞান একসাথে মিলিত হয়ে দেশের দন্তস্বাস্থ্যের উন্নয়নে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে।