মির্জা নাথান, জাতীয় সংরক্ষণ সংস্থার গবেষণা সমিতির প্রধান বিশ্লেষক, গত সপ্তাহে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান সেমিনারে উপস্থাপিত এক প্রতিবেদনে বাংলার দক্ষিণাঞ্চলের বারবুইয়াদের (বারভূঁইয়া) সঙ্গে সমন্বয় করে চলমান হাতি সংরক্ষণ প্রকল্পের গুরুত্ব তুলে ধরেছেন। তিনি বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন যে, ঐতিহ্যবাহী কৃষক সম্প্রদায়ের হাতে থাকা শতবর্ষী হাতি পালনের পদ্ধতি ও জ্ঞান, আধুনিক বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ নীতির সঙ্গে সমন্বয় করলে দেশের বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে। মির্জা নাথানের এই মন্তব্যের পর তৎকালীন সংবাদমাধ্যমে দ্রুতই ব্যাপক আলোচনার সূচনা হয়, কারণ হাতি সংরক্ষণে স্থানীয় সম্প্রদায়ের অংশগ্রহণ দেশের পরিবেশ নীতি পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বারভূঁইয়া সম্প্রদায়ের ঐতিহাসিক পটভূমি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, প্রাচীনকাল থেকে এই জনগোষ্ঠী মধু, তামাক ও ধান চাষের পাশাপাশি বন্যপ্রাণী, বিশেষ করে হাতি, সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখেছে। পূর্বে হাতি শিকারের ফলে তাদের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনা ঘনঘন ঘটলেও, শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে গৃহপালিত হাতি পালন ও তাদের দুধ, ত্বক ও কাজের জন্য ব্যবহার করার প্রথা গড়ে উঠেছে। এই প্রথা শুধুমাত্র অর্থনৈতিক উপার্জনের মাধ্যম নয়, বরং সাংস্কৃতিক পরিচয়ের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নগরায়ণ ও কৃষি জমির হ্রাসের ফলে হাতি ও মানুষের সংঘর্ষ বাড়লেও, বারভূঁইয়া সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতি পুনরুজ্জীবিত করার উদ্যোগ সরকারী ও বেসরকারি সংস্থার সমর্থনে পুনরায় শুরু হয়েছে।
মির্জা নাথানের মন্তব্যের পর বারভূঁইয়া গোষ্ঠীর প্রধান শিবলাল দত্ত বলেন, ‘আমাদের পূর্বপুরুষের কাছ থেকে প্রাপ্ত এই জ্ঞানকে আধুনিক বিজ্ঞান সঙ্গে যুক্ত করলে হাতি সংরক্ষণে নতুন পথ খুলে যাবে।’ তদুপরি, বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ অধিদপ্তরের পরিচালক ড. রুবেল হক জানান, ‘বারভূঁইয়া সম্প্রদায়ের সঙ্গে সমন্বয় করে গৃহপালিত হাতি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন করা হলে বন্যপ্রাণীর সঙ্গে সংঘর্ষ কমবে এবং স্থানীয় অর্থনীতিও সমৃদ্ধ হবে।’ স্থানীয় মিডিয়া ও সামাজিক মাধ্যমেও এই উদ্যোগের প্রশংসা ছড়িয়ে পড়েছে; কৃষক ও যুবকরা হাতি পর্যটন প্রকল্পে অংশগ্রহণের সম্ভাবনা নিয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছে। তবে কিছু পরিবেশবিজ্ঞানী সতর্কতা প্রকাশ করে, ‘প্রথাগত পদ্ধতি ও আধুনিক সংরক্ষণ নীতির সমন্বয় না হলে পরিবেশগত ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে।’
অধিদপ্তর এখন পর্যন্ত তিনটি পাইলট প্রকল্প চালু করেছে, যার মধ্যে দক্ষিণ চট্টগ্রাম জেলায় বারভূঁইয়া গোষ্ঠীর সঙ্গে যৌথভাবে গৃহপালিত হাতি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়ে তোলা হয়েছে। এই কেন্দ্রগুলোতে হাতির স্বাস্থ্য পরীক্ষা, প্রজনন পরিকল্পনা ও পর্যটন গাইড প্রশিক্ষণ অন্তর্ভুক্ত করা হবে। সরকার ২০২৫ সালের মধ্যে বারভূঁইয়া সম্প্রদায়ের সঙ্গে সমন্বয় করে মোট দশটি এমন কেন্দ্র স্থাপনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে, যা বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে স্থানীয় অংশগ্রহণ বাড়াবে এবং গ্রামীণ আয় বৃদ্ধি করবে। ভবিষ্যতে মির্জা নাথান ও তার দল এই মডেলকে জাতীয় পর্যায়ে প্রসারিত করার পরিকল্পনা করছেন, যাতে বাংলার বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে স্থানীয় ঐতিহ্য ও আধুনিক বিজ্ঞান একসাথে কাজ করতে পারে।