দক্ষিণ-পশ্চিম বাংলাদেশের জকিগঞ্জ জেলার টেনেটুন গ্রামে অবস্থিত একমাত্র উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়ে মাত্র দুইজন শিক্ষকই কাজ করছেন, যদিও সেখানে ৪৮৬ জনী শিক্ষার্থী রয়েছে। এই অস্বাভাবিক শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত শিক্ষার গুণগত মানকে মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন করে তুলেছে এবং স্থানীয় সমাজে তীব্র উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। শিক্ষার্থীরা দৈনন্দিন পাঠে যথাযথ দিকনির্দেশনা ও সহায়তা পায় না, ফলে পাঠ্যক্রমের অগ্রগতি ধীর হয়ে পড়ে এবং পরীক্ষার ফলাফলেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। এই পরিস্থিতি কেবল শিক্ষার অধিকার লঙ্ঘন নয়, বরং দেশের মানবসম্পদ উন্নয়নের দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্যকে হুমকির মুখে ফেলে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নিকটবর্তী পর্যবেক্ষণেও দেখা যায় যে, এই ধরনের শিক্ষক ঘাটতি গ্রামীণ ও সীমান্তবর্তী অঞ্চলে প্রায়ই দেখা যায়, তবে টেনেটুনের ক্ষেত্রে বিশেষত দুজনের মধ্যে ৪৮৬ শিক্ষার্থীকে সামলানো একটি অনন্য চ্যালেঞ্জ।
টেনেটুনের অবস্থান জকিগঞ্জের সীমান্তবর্তী এলাকায়, যা ভারতীয় সীমানার নিকটে অবস্থিত এবং প্রধান সড়ক ও যোগাযোগের সুবিধা থেকে দূরে। দীর্ঘ দূরত্ব ও অপর্যাপ্ত পরিবহন ব্যবস্থা শিক্ষকদের জন্য এখানে আসা-যাওয়া কঠিন করে তুলেছে। অতীতে সরকার কিছু শিক্ষককে নিয়োগের মাধ্যমে এই ঘাটতি পূরণ করার চেষ্টা করেছে, তবে নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকরা প্রায়ই কঠোর শর্ত, নিরাপত্তা উদ্বেগ এবং পারিবারিক অসুবিধার কারণে দ্রুত বদলি হয়ে চলে যান। ফলে বিদ্যালয়ের শিক্ষকমণ্ডল বারবার পরিবর্তিত হয়, যা শিক্ষার্থীদের ধারাবাহিক শিক্ষার পরিবেশকে ব্যাহত করে। এই পটভূমি বোঝা গেলে স্পষ্ট হয় যে, শুধুমাত্র নিয়োগই নয়, শিক্ষকদের জন্য উপযুক্ত বাসস্থান, স্বাস্থ্যসেবা ও প্রণোদনা ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি।
স্থানীয় পিতামাতা ও শিক্ষার্থীরা এই পরিস্থিতি নিয়ে গভীর অসন্তোষ প্রকাশ করেছে। এক পিতামাতা বলেন, “আমাদের মেয়ের ভবিষ্যৎ রক্ষা করতে হলে তাকে যথাযথ শিক্ষার পরিবেশ দরকার, কিন্তু দুজন শিক্ষকই ক্লাসের সব কাজ সামলাতে পারছেন না।” শিক্ষকদের প্রতিনিধিত্বকারী সমিতি প্রধানও উল্লেখ করেছেন যে, “শিক্ষকরা এখানে কাজ করতে চায়, তবে নিরাপত্তা, বেতন ও বাসস্থানের অভাব তাদের প্রেরণাকে ক্ষীণ করে দেয়।” বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক, যদিও মাত্র দুইজনের সঙ্গে কাজ করছেন, তবু তিনি শিক্ষার্থীদের মনোবল বজায় রাখতে অতিরিক্ত সময় কাজ করছেন এবং স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবকদের সহায়তা নিচ্ছেন। এই সকল প্রতিক্রিয়া স্পষ্টভাবে দেখায় যে, শিক্ষার মানের অবনতির ফলে সামাজিক অস্থিরতা ও ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা হ্রাস পেতে পারে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও জকিগঞ্জ জেলা প্রশাসন এখন এই সমস্যার সমাধানে ত্বরিত পদক্ষেপ গ্রহণের ঘোষণা দিয়েছে। প্রথমে, অতিরিক্ত পাঁচজন যোগ্য শিক্ষককে অস্থায়ীভাবে নিয়োগ করে বর্তমান ঘাটতি পূরণ করা হবে এবং একই সঙ্গে শিক্ষকদের জন্য বিশেষ বাসস্থান প্রকল্প চালু করা হবে, যাতে তারা নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ পরিবেশে বসবাস করতে পারে। তদুপরি, সরকার সীমান্তবর্তী বিদ্যালয়ের জন্য অতিরিক্ত আর্থিক অনুদান ও শিক্ষাসামগ্রী সরবরাহের পরিকল্পনা করেছে, যাতে শিক্ষার্থীরা প্রয়োজনীয় পাঠ্যপুস্তক ও ল্যাব সরঞ্জাম পেতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে, শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত কমাতে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়ন ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে এবং সফল মডেল হিসেবে অন্যান্য দূরবর্তী অঞ্চলে এই উদ্যোগের পুনরাবৃত্তি করা হবে। এসব পদক্ষেপের মাধ্যমে টেনেটুনের শিক্ষার অবস্থা উন্নত হবে এবং ভবিষ্যতে শিক্ষার্থীদের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত হবে।